Home / জানা অজানা / বর্তমান বিশ্বের সেরা ১০টি গোয়েন্দা সংস্থা কোনগুলো?

বর্তমান বিশ্বের সেরা ১০টি গোয়েন্দা সংস্থা কোনগুলো?

১। মোসাদ, ইসরায়েল

মোসাদকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ ও দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা। ১৩ ডিসেম্বর ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ইংরেজি নাম হচ্ছে (Institute for Intelligence and Special Operations)। বিশ্বজুড়ে ‘মোসাদ’কে ঘিরে সবচেয়ে বেশি রহস্যজনক ও চাঞ্চল্যকর গল্প চালু আছে। হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাতে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদির মৃত্যুর পর বিশ্বের ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নের প্রকল্পে শামিল হয়েছিল। ইহুদি, খ্রিস্ট ও ইসলাম ধর্মের কাছে ‘পবিত্র ভূমি’ বলে পরিচিত বৃহত্তর প্যালেস্টাইনকেই তারা বেছে নিয়েছিল নতুন এই বাসভূমির জন্য। নাৎসিদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদিদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতো। এই জায়নিস্ট আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে শুরু থেকেই আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে আসছে ইসরায়েল। ফলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দূর করতে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে শুরু থেকেই প্রস্তুত ইহুদি এই রাষ্ট্র। আর এ কাজে ভয়াবহভাবে ব্যবহৃত হয় ইহুদিদের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। কিন্তু নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করতে ইসরায়েল যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে এসেছে, তাকে ঘিরে বিতর্কের কোনো শেষ নেই।

ভয়ঙ্কর গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কর্মী সংখ্যা কত তার পরিসংখ্যান কেউ জানে না। তবে ধারণা করা হয় এর কর্মী সংখ্যা কম করে হলেও ১২০০ হবে। এর সদর দফতর ইসরায়েলের তেলআবিবে। সংস্থাটির জবাবদিহিতা দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সংস্থার বর্তমান প্রধান তামির পারদো। মোসাদের প্রধান বিচরণ এলাকা বলতে কিছু নেই। বলা হয়ে থাকে, এদের নেটওয়ার্ক সমগ্র বিশ্বেই বিস্তৃত।

মোসাদের দায়িত্ব এতটাই বিশাল যে, সম্পূর্ণ বর্ণনা কঠিন। সাধারণভাবে বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স পরিচালনা, গুপ্তহত্যা, বৈদেশিক নীতি-নির্ধারণে সহায়তা, কাউন্টার টেররিজম, নিজস্ব লোক সংগ্রহ ও নেটওয়ার্ক তৈরি, বিদেশি কূটনীতিকদের ওপর নজরদারি, শত্রু এজেন্টদের সন্ধান, সাইবার ওয়ারফেয়ার পরিচালনা, নতুন প্রযুক্তি সংগ্রহ, ক্ল্যান্ডেস্টাইন অপারেশন পরিচালনা, ড্রোন আক্রমণ, গুপ্ত কারাগার পরিচালনা, বিশ্বের বড় বড় করপোরেশনের নীতিনির্ধারণের চেষ্টা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্পিওনাজ। মোসাদের এই কাজের বাজেটও কারও জানা নেই।

মোসাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এমএসএস, এফএসবি, এমআইএসআইআরআই, হিজবুল্লাহ, হামাস।

  • বিভিন্ন দেশে মোসাদের কার্যক্রম ও অপারেশন
  • দক্ষিণ আমেরিকা

অনেকদিন থেকে নাযি ওয়ারে অভিযুক্ত এডল্ফ ইচম্যানকে খুজছিল মোসাদ। ১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনায় তার খোঁজ পাওয়া যায়। ওই বছরের ১১মে মোসাদের এজেন্টদের একদল টিম তাকে গোপনে আটক করে ইসরাইল নিয়ে আসে। তার বিরুদ্ধে উত্তর ইউরোপে ক্যাম্প গঠন ও পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে ইহুদিদের হত্যার অভিযোগ আনা হয়। ইসরাইলের আদালতে একটি সাজানো বিচারের মাধ্যমে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। একই অভিযোগে জোসফ মেনজেলকে আটকের চেষ্টা ব্যার্থ হয়। ১৯৬৫ সালে নাযি ওয়ারে অভিযুক্ত লাটভিয়ার বৈমানিক হার্বার্টস কুকার্সকে উরুগুয়ে থেকে ফ্রান্স হয়ে ব্রাজিল যাওয়ার পথে মোসাদের এজেন্টরা হত্যা করে। ১৯৭৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও কুটনৈতিক এবং চিলির প্রাক্তন মন্ত্রী অরল্যান্ডো লেটেলারকে ওয়াশিংটন ডিসিতে গাড়ি বোমায় হত্যা করে চিলির ডিআইএনএ’র এজেন্টরা। পরবর্তীতে জানা যায়, এটি ছিল মোসাদের একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। তার সাথে তার সহকারী রনি কার্পেন মোফিট্টও খুন হন। রনি কার্পেন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।

  • পশ্চিম ইউরোপ

১৯৬০ সালে ফ্রান্সের মিরাজ ফাইভ জেড বিমানের প্রযুক্তিগত দিকের বিভিন্ন দলিল চুরি করে নেয় মোসাদ। পরে ইসরাইল ওই প্রযুক্তিকে আরো উন্নত ও যেকোনো আবহাওয়ার উপযোগি করে জে৭৯ নামের ইলেক্ট্রিক টার্বোজেট ইঞ্জিন তৈরি করে। ফ্রান্স শিপইয়ার্ডে পাঁচটি মিসাইল বোট দিতে ফ্রান্সের সাথে চুক্তি করে ইসরাইল। কিন্তু ১৯৬৯ সালের ফ্রান্সে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার আগে ইচ্ছাকৃতভাবে মিসাইল বোট সরবরাহ করেনি মোসাদ। ১৯৬৮ সালের একটি ঘটনা। ইসরাইলের একটি শিপে ২০০টন ইউরেনিয়াম অক্সাইড সরবরাহ করতে একটি কার্গো বিমান যাত্রা শুরু করেছিল। জার্মনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিমানটি তাদের রাডারের বাইরে চলে যায়। পরে তুরস্কের একটি পোর্টের রাডারে এটি ধরা পড়লে ওই কার্গো বিমান থেকে বলা হয় পথ হারিয়ে তারা এদিকে চলে এসেছে এবং তাদের জ্বালানী ফুরিয়ে গেছে। গালফ থেকে জ্বালানী নিয়ে তারা আবার ফিরে যাবে। পরে তার নিরাপদে ওই ইউরেনিয়াম অক্সাইড ইসরাইলের একটি শিপে খালাস করে। এটি ছিল রেকেম ও মোসাদের একটি যৌথ অপারেশন। এটি অপারেশন প্লামব্যাট নামে পরিচিত। ইউরেনিয়াম অক্সাইড পারমাণবিক বোমার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৭২ সালে মোসাদ জার্মানীর বিভিন্ন টার্গেট ব্যক্তির কাছে পত্র বোমা পাঠিয়েছিল। চিঠি খুললেই বোমা ফুটবে এবং সে মারা যাবে। অধিকাংশ চিঠিই পাঠানো হয়েছি নাযি যুদ্ধে অভিযুক্ত এলোস ব্রানারের কাছে। অবশ্য মোসাদের এ প্রচেষ্টা জানাজানি হয়ে যায় এবং ব্যর্থ হয়।

  • পূর্ব ইউরোপ

যুদ্ধের সময় বসনিয়া হার্জেগোভিনিয়ার রাজধানী সারাজেভো থেকে বিমান ও স্থলপথে ইহুদিদের ইসরাইলে স্থানান্তর করা হয় মোসোদের পরিকল্পনায়।

  • মিশর ও সিরিয়া

১৯৫৭ সালে মিশরে ওলফগ্যাং লজের নেতৃত্বে গোয়েন্দা মিশন পাঠায় মোসাদ। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি মিশরে গামাল আবদেল নাসেরের সামরিক বাহিনী ও তার যুদ্ধোপকরণ ও কৌশল জানতে গোয়েন্দা তৎপরতায় নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৪ সালে লজের চেয়ে বড় মিশন নিয়ে মিশরে গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু করেন মোসাদের আর এক স্পাই ইলি কৌহেন।

এ নিয়ে নেটফ্লিক্সে টিভি সিরিজও আছে, দেখে নিতে পারেন।

তার সহযোগিতায় ছিল হাই প্রোফাইলের বেশ কয়েকজন স্পাই। ইলি কৌহেন ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে সিরিয়ায় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে তথ্য পাঠানোর সময় হাতেনাতে গ্রেফতার হন। মিশর ও সিরিয়ায় মোসাদ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রেডিও লিঙ্ক স্থাপন করেছিল। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ইসরাইলের বিপক্ষে ছিল মিশর, জরডান ও সিরিয়া। এই যুদ্ধটি সিক্স-ডে ওয়ার নামে পরিচিত। যুদ্ধ শেষ হলেও এর রেশ ছিল দীর্ঘ দিন। ১৯৬৯ সালের ১৯ জুলাই মিশরের ছোট দ্বীপ গ্রিন আয়ল্যান্ডে ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্স আকস্মিক হামলা চালায়। মোসাদ এই অভিযানের নাম দেয় অপারেশন বালমাস সিক্স। পরবর্তীতে অনেক ইসরাইলী ইহুদি ও পর্যটকরা সিনাই হতে মিশর আসে অবকাশ যাপনের জন্য। মোসাদ নিয়মিত এসব পর্যটকদের নিরাপত্তা দেখভালের জন্য গোয়েন্দা পাঠাত। ধারণা করা হয় এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে লেবানন যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

  • ইরান

ইসরাইল ইরানকে বড় ধরনের হুমকি মনে করে। ফলে মোসাদের তৎপরতা ইরানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৭ সালের ১৫ জানুয়ারি ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানী ড. আরদেশির হোসেনপুরকে হত্যা করে মোসাদ। মৃত্যুর ছয় দিন পর আল কুদস ডেইলি তার নিহতের খবর প্রচার করে। প্রথম দিকে তিনি গ্যাস বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা সে দেশের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টের কাছে এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। ওয়াশিংটনের প্রাইভেট গোয়েন্দা সংস্থা স্ট্রাটফোর হোসেনপুরকে মোসাদের টার্গেট ছিল বলে উল্লেখ করে। অবশ্য মোসাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। হোসেনপুর ছিলেন ইরানের একজন জুনিয়র সহকারী অধ্যাপক। ২০০৩ সাল থেকে ইরানে মোসদের হয়ে কাজ করতেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী রেজা আসগারি। তিনি মোহাম্মদ খাতামী প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ইরানের সহকারী প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন। ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাকে সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসাননি।

  • ইরাক

সিআইএ’র সহায়তায় ইরাকে বাথ পার্টির শীর্ষনেতা আরিফ রহমান ও পরবর্তীকালে সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতায় আসলেও ইরাককে বিশ্বাস করত না ইসরাইল। এজন্য ইরাকে ইসরাইলের গোয়েন্দা তৎপরতার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ইরাকে সিআইএ মোসাদের সহযোগি হিসেবে কাজ করেছে। ইরাকে অনেকগুলো বড় অপারেশন চালায় মোসাদ। এর একটি হচ্ছে ১৯৬৬ সালে। মিগ ২১ জঙ্গী বিমানের পাইলট ছিলেন খৃস্টান বংশদ্ভূত মুনির রিদফা। ১৯৬৬ সালে তাকে বিমানসহ কৌশলে ইরাক থেকে ইসরাইল নিয়ে আসে মোসাদ। তার কাছ থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ব্যবহার করা হয় ইরাক বিরোধী প্রচারণায়। সংবাদ সম্মেলন করে ইরাকে খৃস্টান নিধনের প্রচারণাও চালানো হয়। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ইরাকের অসরিক নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর’র (নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার শক্তি উৎপাদনের জন্য যন্ত্রবিশেষ) স্পর্শকাতর কিছু বিষয়ে গোয়েন্দা তৎপরতা চালায়। এই অপারেশনের নাম দেয়া হয় অপারেশন স্ফিঙকস। ইরাক এই গবেষণা সম্পন্ন করতে পারলে পারমাণবিক গবেষণায় বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে অগ্রবর্তী থাকত। মোসাদ মনে করেছিল এখনই যদি এই প্রোগ্রাম ধ্বংস করা না হয় তাহলে শিগগিরই গবেষণা সেন্টারে পারমাণবিক অস্ত্রের কাঁচামাল সরবরাহ করা হবে। এজন্য ১৯৮১ সালের ১৭ জুন এফ-১৬এ যুদ্ধ বিমানে বিপুল গোলাবারুদসহ একটি ইউনিটকে পাঠানো হয় ইরাকের এই প্রকল্প ধ্বংস করে দেয়ার জন্য। ইরাক কিছু বুঝে ওঠার আগেই বোমা হামলা করে অসরিক নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর’র ব্যাপক ক্ষতি করে। ইরাক পরে আর এ প্রকল্পটি অব্যাহত রাখতে পারেনি। এই হামলাটি অপারেশন অপেরা নামে পরিচিত। কানাডার বিজ্ঞানী গিরাল্ড বুল বিভিন্ন দেশে স্যাটেলাইট গবেষণায় কাজ করতেন। ইরাক স্যাটেলাইট উন্নয়ন প্রোগ্রাম ‘প্রোজেক্ট ব্যবিলন’-এর ডিজাইন করলে তাকে ১৯৯০ সালের ২২ মার্চ বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে তার বাড়ির বাইরে গুলি করে হত্যা করে মোসাদ।

  • ইতালী

ইসরাইলের পারমাণবিক প্রোগ্রামের গোপন তথ্য বৃটিশে পাচার করার কারণে ১৯৮৬ সালে ইতালির রাজধানী রোম থেকে ইসরাইল নাগরিক মোডাচাই ভ্যানুনুকে অপহরণ করে ইসরাইল নিয়ে আসে মোসাদ। পরে তাকে জেলে ঢুকানো হয়।

  • ফিলিস্তিন

১৯৭০ সালে ফিলিস্তিনে এক নয়া গ্রুপ গড়ে উঠে ব্লাক সেপ্টেম্বর নামে। জার্মানির মিউনিখে অলিম্পিক গেমস চলাকালে এরা ১১ জন ইসরাইলী এথলেটকে কিডন্যাপ করে। ২০০ ফিলিস্তিনির মুক্তি ও নিজেদের সেইফ পেসেজ দেওয়া ছিলো ওদের দাবী, জার্মান সরকার মেনে নেয় এবং চুক্তির জন্য মিলিটারি এয়ারপোর্টে আসতে বলে।মিলিটারি এয়ারপোর্টে জার্মান এয়ারফোর্সকমান্ডোরা আগে হতেই প্রস্তুত ছিলো। অপহরনকারীরা যখনই বুঝতে পারে ওদের ফাদে ফেলা হয়েছে তখনই সব বন্দী এথলেটদের হত্যা করা হয়।পুলিশের পাল্টাগুলিতে ৫ জন অপহরনকারী নিহত ও তিন জন বন্দী হয়।

ঘটনাটি ছিলো অতি ভয়াবহ। মোসাদ স্পেশাল টিম গঠন করে অপারেশান রথ অফ গড ঘোষণা করে। পুরো ইউরোপ জুড়ে ব্লাক সেপ্টেমবারগ্রুপকে খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয়।৭২ হতে ৭৩ পর্যন্ত এই গুপ্তহত্যার কাজ চলতে থাকে। পিএলওর নেতারা প্রায় দিশা হারাবার উপক্রম।ইউরোপ জুড়ে মোসাদের এই হান্টিং ডাউনে ভুলক্রমে নরওয়েতে এক নিরীহ মরোক্কান ওয়েটারকে হত্যা করে ফেলে মোসাদ।নরওয়ের পুলিশ ৬ মোসাদ এজেন্টকে গ্রেফতার করে।

ইসরায়েলের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি শোহাম ‘কোভিড ১৯’ বা করোনা ভাইরাসকে চীনের উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির গবেষণাগারে তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেন। চীনের জীবাণু যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, চীনের গোপন জীবাণু অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এই ইনস্টিটিউটের কিছু ল্যাবরেটরিতে চীনের নতুন নতুন জীবাণু অস্ত্র তৈরি এবং এসব অস্ত্র নিয়ে গোপনে গবেষণা করা হয়। সামরিক-বেসামরিক গবেষণার অংশ হিসেবে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে জীবাণু অস্ত্রের ওপর সেখানে কাজ পরিচালিত হয়। মেডিকেল মাইক্রোবায়োলজিতে ডক্টরেট করেছেন ইসরায়েলের সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তা।

ড্যানি শোহাম ১৯৭০ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা শাখার জীবাণু এবং রাসায়নিক অস্ত্রের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন।

এ অভিযোগ শুধু ইসরায়েলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার নয়, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এমনটা বিশ্বাস করেন। ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, করোনাভাইরাস চীনের কাজ, তারাই দায়ী। এরপরই ট্রাম্পের সমর্থকেরা সরাসরি চীনের বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্র তৈরি করার অভিযোগ আনেন।

২। এমআই সিক্স, যুক্তরাজ্য

সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস বা এমআই৬ যুক্তরাজ্য সরকার তথা ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের বৈদেশিক গুপ্তচর বিভাগের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা হিসেবে এমআই৫, সরকারি যোগাযোগের প্রধান দফতর বা জিসিএইচকিউ, প্রতিরক্ষা সংস্থা বা ডিআইয়ের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে। যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কমিটি বা জিআইসি’র নিয়ন্ত্রণে থেকে নির্দিষ্ট নির্দেশনার মাধ্যমে কাজ করে সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস।

এটা বার বার এমআই৬ নামে গণমাধ্যমে উল্লেখ হতে থাকে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যখন সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস নামটি বহুনামে উল্লেখ হয়, তখন এমআইসিক্স নামকরণটি নিশ্চিত হয়ে যায়।[১] ১৯৯৪ সালের আগ পর্যন্ত এমআই৬ নামটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়নি ও স্বীকৃত ছিল না। সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস বা এসআইএস বা এমআই৬ বর্তমানে ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে গুপ্তচরের প্রধান ভূমিকা পালনে সক্ষম।

১৯০৯ সালে উইলিয়াম মেলভিল নামক সিক্রেট সার্ভিস ব্যুরোর এক কর্মকর্তা সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা।[১] দফতরটি নৌ-সেনা বিভাগ এবং যুদ্ধ অফিসের যৌথ উদ্যোগে গ্রেট ব্রিটেন ও বিদেশের মধ্যে গোয়েন্দা অভিযানের দায়িত্ব নিয়োজিত ছিল। এটি বিশেষ করে জার্মান সাম্রাজ্যের কার্যকলাপের ওপরই সবিশেষ মনোযোগ দিয়েছিল। ব্যুরো বা দফতরটি নৌ এবং সেনা- এ দুই বিভাগে বিভাজন করা হয়েছিল। এগুলো হলো : বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তি এবং অভ্যন্তরীণ গুপ্তচরবৃত্তি। এই বিভাজনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল নৌ-সেনা বিভাগ। তারা জার্মান সাম্রাজ্যের নৌবাহিনীর সামরিক শক্তিমত্তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী ছিল। এই বিশেষায়ন ১৯৪১ সালের আগেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সৃষ্টি করা হয়েছিল।

যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, দুটি শাখাই প্রশাসনিকভাবে রূপান্তরিত হয়ে ডাইরেক্টরেট অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স সেকশন ৬ (এমআইসিক্স) হয়ে যায়। এ নামই বর্তমানকালে সাধারণ নাম হয়ে এমআই ৬ হিসেবে সর্বসাধারণ্যে পরিচিতি পেয়ে আসছে। সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস সংস্থাটির ভবনের অঙ্গসজ্জা জেমস বন্ড চলচ্চিত্রের গোল্ডেনআই, দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ নট এনাফ এবং ডাই এনোদার ডে ছবিতে দেখানো হয়েছে। এমআইসিক্স প্রথমবারের মতো ভবনের অঙ্গসজ্জা জেমস বন্ড সিরিজের ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ নট এনাফ’ চলচ্চিত্রে প্রদর্শনের অনুমতি প্রদান করে। ওই চলচ্চিত্রে ভবনের অভ্যন্তরে ব্রিফকেস পরিপূর্ণ টাকায় বিস্ফোরণ ঘটানোর দৃশ্য ধারণ করা হয়।

এমআই সিঙ্ গঠিত হয় ১৯০৯ সালে সিক্রেট সার্ভিস ব্যুরো নামে। এর সদর দফতর : ভাউঙ্ হলো ক্রস, লন্ডন-এ। এর দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হচ্ছে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ। আর সংস্থা প্রধান : স্যার জন সারোয়ার্স। এটির মূল দায়িত্ব হচ্ছে বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স পরিচালনা, বন্ধুভাবাপন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, দেশ ও মিত্রদের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রক্ষায় গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালনা। এমআই৬ এর বিখ্যাত এজেন্ট জেমস বন্ড। আর এর বিখ্যাত অপারেশন অপারেশন কাপকেক।

৩। সিআইএ, যুক্তরাষ্ট্র

সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ইংরেজি : Central Intelligence Agency) (CIA), যা সিআইএ নামেও পরিচিত, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাধীন একটি বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। এটি একটি স্বাধীন সংস্থা, যার দায়িত্ব্ব যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা। দ্বিতীয় বিশ্বযদ্ধকালীন গঠিত অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস (OSS)-এর উত্তরসূরি হিসেবে সিআইএর জন্ম। এর কাজ ছিল যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করা। ১৯৪৭ সালে অনুমোদিত হওয়া ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বা জাতীয় নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সিআইএ গঠন করা হয়, যাতে বলা হয়, ‘এটি কোনো পুলিশ বা আইন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান নয়, দেশে কিংবা বিদেশে যেখানেই কাজ করুক না কেনো।’ সিআইএ’র প্রাথমিক কাজ হচ্ছে বিদেশি সরকার, সংস্থা ও ব্যক্তিদের সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করা এবং তা জাতীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে তা সরবরাহ ও পরামর্শ প্রদান করা। সিআইএ এবং এর দায়বদ্ধতা ২০০৪ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০০৪-এর ডিসেম্বরের পূর্বে সিআইএ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান গোযন্দো সংস্থা; এটি শুধু নিজের কর্মকাণ্ডই নয়, বরং অন্য গোয়ন্দো সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডও দেখাশোনা করত। কিন্তু ২০০৪ সালে অনুমোদিত ইন্টেলিজেন্স রিফর্ম অ্যান্ড টেররিজম প্রিভেনশন অ্যাক্ট, ২০০৪ দ্ব্বারা তা পরিবর্তিত হয়।

সিআইএ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। এর কর্মীসংখ্যা অজ্ঞাত। তবে অনুমানিক এই সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি হতে পারে। এর সদর দফতর ল্যাংলি, ভার্জিনিয়ার জর্জ বুশ সেন্টার ফর ইন্টেলিজেন্সে। এর জবাবদিহিতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে। সিআইএ’র বর্তমান সংস্থা প্রধান ডেভিড পেট্রাউস। বর্তমানে সিআইএ’র বেশ কয়েকটি বিভাগ রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে : মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগ MENA, দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ OSA, রাশিয়ান ও ইউরোপিয়ান বিভাগ OREA, এশিয়া প্যাসিফিক, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা বিভাগ (APLAA)।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র কাজের পরিধিও সুবিশাল। সাধারণভাবে বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স পরিচালনা, গুপ্তহত্যা, বৈদেশিক নীতিনির্ধারণে সহায়তা, কাউন্টার টেররিজম, নিজস্ব লোক সংগ্রহ ও নেটওয়ার্ক তৈরি, বিদেশি কূটনীতিকদের ওপর নজরদারি, শত্রু এজেন্টদের সন্ধান, সাইবার ওয়ারফেয়ার পরিচালনা, নতুন প্রযুক্তি সংগ্রহ, ক্ল্যান্ডেস্টাইন অপারেশন পরিচালনা, ড্রোন আক্রমণ, গুপ্ত কারাগার পরিচালনা, বিশ্বের বড় করপোরেশনগুলোর নীতিনির্ধারণের চেষ্টা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্পিওনাজ। সিআইএ’র ঘোষিত বাজেটের পরিমাণ ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর প্রধান বিচরণ এলাকা সমগ্র সৌরজগৎ। আর সিআইএ’র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী : এমএসএস, এফএসবি, আল-কায়েদা। সিআইয়ের বিখ্যাত অপারেশনের মধ্যে রয়েছে বে অব পিগস হামলা, বিন লাদেন হত্যা, অপারেশন ফোনিক্স (ভিয়েতনাম), অপারেশন গ্লাডিও প্রভৃতি।

৪। এমএসএস, চীন

চীনের গোয়েন্দা সংস্থা গওজিয়া অ্যাংকেন বু অথবা মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি। এটি বিশ্বজুড়ে এমএসএস (MSS) নামে পরিচিত। চীনা এমএসএসের অনেক কিছুই সাধারণ মানুষের অজানা। আর এর কর্মী সংখ্যা পৃথিবীর সব গোয়েন্দা সংস্থার তুলনায় সবচেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হয়। ২০০৫ সালে দলত্যাগী দুজন চীনা এজেন্ট থেকে জানা গেছে, শুধু অস্ট্রেলিয়ায়ই এমএসএস’র এক হাজার ইনফর্মার আছে। এমএসএসের সদর দফতর চীনের রাজধানী বেইজিং-এ অবস্থিত। এর জবাবদিহিতা স্টেট কাউন্সিল অব চায়নার কাছে। এমএসএসের সংস্থা প্রধান জেং হুই চ্যাং। তিনি দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এমএসএস সর্বমোট ১২টি ব্যুরোতে বিভক্ত। এর মূল দায়িত্ব হচ্ছে বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স পরিচালনা, গুপ্তহত্যা, বর্ডার সার্ভেইল্যান্স, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, কাউন্টার টেররিজম, নিজস্ব লোক সংগ্রহ ও নেটওয়ার্ক তৈরি, বিদেশি কূটনীতিকদের ওপর নজরদারি, শত্রু এজেন্টদের সন্ধান, কাউন্টার রেভিউল্যুশনারি কার্যক্রম দমন, সাইবার ওয়ারফেয়ার পরিচালনা, নতুন প্রযুক্তি সংগ্রহ, বিশ্বের বড় করপোরেশনগুলোর নীতিনির্ধারণের চেষ্টা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্পিওনাজ।

এমএসএসের প্রধান বিচরণ এলাকা ম্যাকাও, হংকং, তাইওয়ান, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, পশ্চিম ইউরোপ, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকা ও সারা দুনিয়ার চাইনিজ বংশোদ্ভূত জনগণ। এমএসএসের অনেক নামকরা এজেন্ট রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ল্যারি উ তাইচিন, ক্যাট্রিনা লেউং, পিটার লি, চি মাক, কো সুয়েন মো। ১৯৯৬ সালে এফ-১৫, বি-৫২সহ বহু সামরিক প্রযুক্তি পাচারের অভিযোগে ডং ফ্যাং চ্যু নামে বোয়িং কোম্পানির এক ইঞ্জিনিয়ার ধরা পড়েন। ধারণা করা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউকে, কানাডা, ইউরোপ, ভারত, জাপানে আন-অফিশিয়াল কাভারে যেমন ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, খেলোয়াড়, ব্যাংকার, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ হিসেবে কমপক্ষে ১২০ জন এমএসএস কর্মী অবস্থান করছেন। এমএসএসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হয় সারা দুনিয়ার বেশিরভাগ গোয়েন্দা সংস্থাকেই।

৫। এফএসবি, রাশিয়া

এফএসবির মূল নাম ফেডারেলনায়া সুলঝবা বেজপাসনোস্তি রাশিস্কয় ফেডেরাটসি। সংক্ষেপে এটি এফএসবি নামে পরিচিত। এটি স্থাপিত হয় ১৯৯৫ সালের ৩ এপ্রিল। তবে এত অল্প বয়স দিয়ে এফএসবির কার্যকারিতার প্রভাব ও ভয়াবহতার কথা মোটেও অনুমান করা যাবে না। অনুমান করতে হবে এর পূর্বসূরি সংস্থার কথা মাথায় রেখে। রাশিয়ার বর্তমান গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির

পূর্বসূরি ছিল দুনিয়া কাঁপানো গোয়েন্দা সংস্থা KGB। আর কেজিবিরও আগে এর নাম ছিল চেকা। এফএসবির কর্মী সংখ্যা আনুমানিক ৩,৫০,০০০।

এফএসবির সদর দফতর রাশিয়ার মস্কো শহরের ল্যুবিয়াঙ্কা স্কোয়ারে। এর জবাবদিহিতা প্রেসিডেন্ট রাশিয়ান ফেডারেশন।

এফএসবির সংস্থা প্রধান মিখায়েল ফার্দকভ। এফএসবির সাহায্যকারী/সহকারী সংস্থার নাম গ্রু। এফএসবির মোট ১০টি বিভাগ রয়েছে।

এফএসবির মূল দায়িত্ব বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স পরিচালনা, গুপ্তহত্যা, বর্ডার সার্ভেইল্যান্স, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, কাউন্টার টেররিজম, নিজস্ব লোক সংগ্রহ ও নেটওয়ার্ক তৈরি, বিদেশি কূটনীতিকদের ওপর নজরদারি। এফএসবির নামকরা এজেন্টের নাম আন্না চ্যাপম্যান।

৬। বিএনডি (BND)

জার্মানির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার নাম জার্মান ভাষায় বুন্দেসন্যাচরিচটেনডিয়েনস্ট বা বিএনডি (BND)। ইংরেজিতে ফেডারেল ইনটেলিজেন্স সার্ভিস। বার্লিনে অবস্থিত সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে চার হাজার কর্মী একসঙ্গে কাজ করে। বিশাল এই কার্যালয়টি প্রায় ৩৫টি ফুটবল মাঠের সমান। বিএনডি বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কাউন্টার ইনটেলিজেন্স পরিচালনা, বিভিন্ন দেশে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করা, কাউন্টার টেররিজম, নিজস্ব লোক সংগ্রহ ও নেটওয়ার্ক তৈরিতে কাজ করে।

৭। আইএসআই

আইএসআই বিশ্বের সব থেকে বিতর্কিত গোয়েন্দা সংস্থা। পাকিস্তানে ‘সরকারের ভিতরে সরকার’ নামে বহুল পরিচিত ও ক্ষমতাধর ক্ষমতাধর গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। সংস্থাটির মূল প্রতিদ্বন্দ্বি র এবং মোসাদ। আইএসআই এর বিখ্যাত মিশন গুলো হলো সোভিয়েত বিরোধী আফগান যুদ্ধ, কার্গিল যুদ্ধ, ওয়ার অন টেরর ওয়াজিরিস্তান এবং বালুচিস্তানে আকবর বুগাতি হত্যাকান্ড।

ভারতের সিক্রেট সার্ভিস ‘র’ এর জন্ম হয়েছিল পাকিস্তান ভেঙে দেয়ার জন্য, তারা সেই কাজে সফল হয়েছে। আর সফল হয়েছে সিকিমে। ভারতের ইনফ্লুয়েন্স দিন কে দিন কমছে মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলংকায়। আর এই সব দেশ এখন চীনা বলয়ে উইথ দ্যা হেল্প অফ পাকিস্তান এন্ড ইটস ‘আইএসআই’। বলা হয় আমেরিকার সাথে ইজরায়েলের যেরকম সম্পর্ক, তেমন সম্পর্ক চীন আর পাকিস্তানের মাঝে।

ভারতের সাথে পাকিস্তানের আজীবনের শত্রুতা। উপরে উপরে ব্যবসা বানিজ্য কূটনৈতিক সম্পর্ক যাই থাকুক না কেন এই দুই রাষ্ট্র কোনদিন একে অপরকে বিশ্বাস করে না, আর করবেও না। ‘র’ বনাম ‘আইএসআই’ এর প্রছন্ন আর প্রক্সি যুদ্ধে দুই দেশ একে অপরের ভূমিতে ক্রমাগত একের পর এক অপারেশান চালিয়ে যাচ্ছে। ভুগছে দেশের মানুষ, কিন্তু তাতে দুই রাষ্ট্রের তেমন মাথা ব্যাথা নেই, কারন এটা অস্তিত্বের লড়াই। আর বাকি সব কিছুকে তারা কোল্যাটারাল ড্যামেজ হিসাবে গন্য করছে। একই ভাবে হিসাব করে বিশ্বের সব ইন্টালিজেন্স এজেন্সি। সাধারন মানুষ মারা তাদের কাছে জাস্ট কোল্যাটেরাল ড্যামেজ। যেখানে মোরালিটি আর এথিক্স টেইক্স এ ব্যাক সিট। আর এটাই রিয়েলিটি।

আফগানিস্তানের বিগ গেইম এর অন্যতম ইঞ্জিনিয়ার ছিল ‘আইএসআই’। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে যুদ্ধ ঘোষণা করে বিপুল সংখ্যক ট্যাঙ্ক, হেলিকপ্টার, সেনা পাঠায়, তখন ‘আইএসআই’ আফগানিস্তান থেকে কমিউনিস্টদের তাড়াতে ‘সিআইএ’ কে ডেকে আনে। আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধের হারের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নকেই দায়ী করে, ফলত তারা প্রতিশোধের এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করে নাই। ফলাফল, আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের হার, পরিশেষে সিভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া। কিন্তু এর জন্য যতটা কৃতিত্ব সিআইএ কে দেয়া হয় তার চাইতে অনেক বেশি কৃতিত্বের হকদার আইএসআই। যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

আফগান যুদ্ধে আইএসআই সিআইএ কে অনেকবার ডাবল ক্রস করেছে, সোজা বাংলায় যাকে বলে বেকুব বানিয়েছে। একই কাজ করেছে ওসামা বিন লাদেনকে এবোটাবাদে লুকিয়ে রেখে। যার কারনে আমেরিকা পাকিস্তানকে তেমন আগের মতন বিশ্বাস করে না। না করলেও আল কায়দার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকার পাকিস্তানের আর্মি আর ইন্টালিজেন্স এজেন্সিকে ডিঙ্গানোর কোন উপায় নাই। এই নিয়ে আরেকদিন লিখব। পাকিস্তান এখন ভালো সম্পর্ক স্থাপন করেছে রাশিয়া আর ইরানের সাথেও। তারা এখন এই অঞ্চলের দুর্দান্ত এক শক্তি, যা এই মুহূর্তে ভারতের ঈর্ষার অন্যতম কারন। আর সেই কারনেই ভারত চেষ্টা করছে বাংলাদেশকে পুরাপুরি নিজ আয়ত্তে নিয়ে তার দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলে চীনের এক্সেস কমাতে। আর যেথায় চীন সেখানেই পাকিস্তান।

আইএসআই যত বেশি প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করে তা আর কোন সিক্রেট সার্ভিসকে করতে হয় বলে মনে হয় না। এক আফগানিস্তানের মাটিতে এখন আইএসআই কে একসাথে মোকাবেলা করতে হচ্ছে সিআইএ, মোসাদ, ‘র’, এমআই৬, এমন কি এসভিআর (ফর্মার কেজিবি)। দ্যাটস এ লং লিস্ট। বাট একই সাথে আইএসআই আরও বেশি দক্ষ হয়ে উঠছে তদের কাজের এক্সপেরিয়েন্সের কারনে।

‘আইএসআই’ এর ইনফিল্ট্রেশান বা অনুপ্রবেশ ক্ষমতা ‘র’ এর চাইতে বেশি আর সুদূরপ্রসারী। রাশিয়ার চেচনিয়া, দক্ষিন আমেরিকা, ইউরোপ, নর্থ আফ্রিকা, সেন্ট্রাল এশিয়ার প্রত্যেকটা দেশ, মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্যেকটা দেশ থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, এমনকি ইজরায়েলে পর্যন্ত আইএসআই এর বলয় বিস্তৃত। চীনের সিক্রেট সার্ভিসের সাথে আইএসআই এর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, শুধু ইনফো আদান প্রদানই নয়, পাকিস্তান চীনের সারভেইলেন্স স্যাটেলাইট থেকে শুরু করে অনেক গোপন সারভেইলেন্স টেকনোলজি ব্যবহার করে। গত কয়েকবছর ‘র’ এর একার পক্ষে ‘আইএসআই’ কে পাল্লা দেয়া অনেক কঠিন হয়ে পরেছে। তাই ‘র’ কে নিতে হচ্ছে ইজরায়েলের মোসাদের সাহায্য। কিন্তু সেখানেও যে আইএসআই এর কোন সংযোগ নাই তা নয়। সিআইএ-আইএসআই-মোসাদেরও একটা যোগসাজশ আছে। তবে সাধারণত এরা একে অপরের সিক্রেট কারো কাছে বলে না।

আন্তর্জাতিকভাবে আইএসআই এর খ্যাতি একটি দুর্ধর্ষ, প্রাণঘাতী, আর ধূর্ত শক্তি হিসাবে। আধুনিক দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে এছাড়া আর উপায় নাই, আর পাকিস্তান তা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে করে আসছে। আইএসআই এর বেশ কিছু ভুল আছে, তবে তাদের সারভাইভালের জন্য তাদের যা করা দরকার তা করতে তারা বদ্ধ পরিকর, এবং আজ পর্যন্ত পাকিস্তান কারো করদ রাজ্যে পরিনত হয় নি। যার জন্য প্রধানত দায়ী পাকিস্তানের আইএসআই আর আর্মি। যদিও সংবিধান অনুযায়ী আইএসআই পাকিস্তান সরকারের অধীনে থাকার কথা কিন্তু কার্যত আইএসআই অটোণোমাস। সেজন্য আইএসআই কে বলা হয় ‘এ স্টেট উইদিন এ স্টেট’।

*ওদের লোগোটা একটু দেখেন, ওদের জাতীয় পশু মারাখোর জাতের ছাগল

ছাগল কিভাবে গোয়েন্দা বাহিনীর সাথে যায় বুঝলাম না! 🤣🤣🤣

৮। রিসার্চ অ্যান্ড এনালাইসিস উইং (RAW)

ভারতের আলোচিত গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ এন্ড এনালাইসিস উইং প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর । এর প্রধান কাজ হল বিদেশি গোপন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কাউন্টার টেরোরিজম এবং গোপন অপারেশন চালানো। র’ বিদেশি সরকার, ব্যাবসায়ী, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করে থাকে এবং সে অনুযায়ী ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের পরামর্শ দিয়ে থাকে। এশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে র এর এজেন্ট রয়েছে। র’ তাদের যাবতীয় গোয়েন্দা প্রযুক্তি ও অস্ত্র-শস্ত্রের জন্য মোসাদের সহযোগিতা পেয়ে থাকে।

৯। ডিজিএসই (DGSE)

ফ্রান্সের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা হলো ডিজিএসই । এর সদর দফতর প্যারিসে। ডিজিএসই ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পরিচালিত হয়। এর প্রধান কাজ হল বাইরের দেশের বিভিন্ন সূত্র থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং তা মিলিটারি এবং নীতিনির্ধারকদের কে সরবরাহ করা। ডিজিএসইতে প্রায় ৫ হাজারের বেশি কর্মকর্তা কাজ করেন।

১০। এএসআইএস (ASIS)

স্ট্রেলিয়ার সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা এএসআইএস। প্রধান কার্যালয় ক্যানবেরাতে। সংস্থাটি ১৯৫২ সালের ২৩ মে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংস্থাটি ২০ বছর পর্যন্ত গোপন ছিল। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার সরকারও এই এজেন্সি সম্পর্কে জানতো না। এর প্রধান কাজ হল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা।